সোমেন চন্দ, মাত্র ২২ বছর বয়সে যিনি কলমকে হাতিয়ার করে সাম্য ও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই চিত্রবইটি সেই অদম্য কিশোরের জীবন, তাঁর বিপ্লবী সংগ্রাম এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের এক অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা। মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আত্মত্যাগ ও অমর লেখনীর মাধ্যমে এক নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন আজও আমাদের পথ দেখায়।
নদীর ধারে সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে ছোট্ট সোমেন, তার হাতে একটি গল্পের বই। তার চোখ দুটি স্বপ্নীল, যেন সে কল্পনার ডানায় ভর করে অজানা এক জগতে ভেসে বেড়াচ্ছে। সূর্য নরম আলো ছড়াচ্ছে তার মুখে, আর বাতাসে বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছে আপন মনে।
ঢাকার পোগজ স্কুলের ক্লাসরুমে সোমেন মনোযোগ দিয়ে শুনছে শিক্ষকের কথা। তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটি কৌতূহলে ভরা। সহপাঠীরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর সে সহজেই দিয়ে দিচ্ছে।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে সোমেনকে মেডিকেলের বই ছেড়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু তার মুখে কোনো দুঃখ নেই, বরং দৃঢ় সংকল্পের ছাপ। সে এখন সমাজ ও বিপ্লবের বই পড়ছে, তার চারপাশে বইয়ের স্তূপ, যা নতুন এক পথের ইশারা দিচ্ছে।
এক পুরনো বাড়ির ছোট ঘরে সোমেন তার রাজনৈতিক গুরু রণেশ দাশগুপ্তের সাথে বসে আছে। রণেশ তাকে বিপ্লবের পথ দেখাচ্ছেন, আর সোমেন মন দিয়ে শুনছে, তার চোখে নতুন এক স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। তাদের পাশে আরও কয়েকজন উজ্জ্বল মুখের তরুণ।
রেলওয়ে বস্তিতে শ্রমিকদের ভিড়ে সোমেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। সে হাসিমুখে তাদের সাথে কথা বলছে, তাদের অধিকারের কথা বোঝাচ্ছে। শ্রমিকরা তার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে হাততালি দিচ্ছে, তাদের মুখে আশার আলো।
'ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের' এক সমাবেশে সোমেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিচ্ছে। তার পেছনে উজ্জ্বল রঙের একটি ব্যানার, যেখানে লেখা 'ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক!' শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছে।
সোমেন তার ছোট ঘরে বসে তার বিখ্যাত গল্প 'ইঁদুর' লিখছে। কলম হাতে তার মুখটি চিন্তামগ্ন, কিন্তু তার চোখে সৃষ্টির আনন্দ। একটি ছোট্ট ইঁদুর যেন পাশে উঁকি মারছে, তার গল্পে প্রাণ পাচ্ছে।
ঢাকার রাস্তায় রেলওয়ে শ্রমিকদের একটি বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছে সোমেন। তার হাতে একটি উজ্জ্বল ব্যানার, যেখানে মুক্তির স্লোগান লেখা। শ্রমিকরা তার পেছনে জয়ধ্বনি দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে, তাদের পদধ্বনি যেন বিপ্লবের সুর।
হঠাৎ করে দৃশ্যপট বদলে যায়। কিছু উগ্রবাদী লোক লাঠি আর ধারালো অস্ত্র হাতে সোমেনকে ঘিরে ধরেছে। সোমেন তাদের দিকে দৃঢ় চোখে তাকিয়ে আছে, তার মুখে ভয় নেই, শুধু অদম্য সাহস। শ্রমিকরা হতভম্ব হয়ে দেখছে।
একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চিত্র। সোমেনের একটি বিশাল, অনুপ্রেরণাদায়ক মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটি কলম। তার চারপাশে তরুণ-তরুণীরা বই হাতে নিয়ে হাঁটছে, তাদের চোখে সোমেনের স্বপ্ন। সূর্যালোকে সবকিছু ঝলমল করছে, যেন সোমেনের আদর্শ চিরকাল বেঁচে আছে।
Generation Prompt
সোমেন চন্দ: এক অমর কলম ও বিপ্লবের গল্প বিপ্লব কেবল বন্দুকের নলে হয় না, বিপ্লব হয় কলমের আঁচড়েও। মাত্র ২২ বছরের এক কিশোর, যার কাঁধে ছিল বইয়ের ঝোলা আর বুকে ছিল সাম্যের গান—তিনিই সোমেন চন্দ। বাংলার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ, যিনি মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য নিজের রক্ত বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সেই লড়াই আর অমর লেখনীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। ১৯২০ সালের ২০ মে, অবিভক্ত বাংলার নরসিংদী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সোমেন চন্দ। তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় ঢাকার বিখ্যাত পোগজ স্কুলে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও চিন্তাশীল। ১৯৩৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাসের পর তিনি ঢাকা মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু ফুসফুসের অসুস্থতার কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর বিপ্লবী সত্তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং তিনি নিজেকে উজার করে দেন পড়াশোনা আর সাংগঠনিক কাজে। মেডিকেল স্কুল ছাড়ার পর সোমেন চন্দ পুরোপুরিভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষের মুক্তি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের মধ্যে নিহিত। তিনি ঢাকার রেলওয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। দিনরাত তাদের বস্তিতে কাটাতেন, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যখন ফ্যাসিবাদ সারা বিশ্বে থাবা বাড়াচ্ছিল, সোমেন তখন রাজপথে সোচ্চার হন। তিনি ছিলেন 'ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের' একনিষ্ঠ কর্মী। সোমেন চন্দ একা লড়েননি; তাঁর সাথে ছিলেন একঝাঁক মেধাবী ব্যক্তিত্ব। সোমেনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও রাজনৈতিক অভিভাবক রণেশ দাশগুপ্ত, সাম্যবাদী সাহিত্যিক ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী সতিশ পাকড়াশি, প্রগতিশীল সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ অচ্যুত গোস্বামী, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অমৃতেন্দু মুখোপাধ্যায় যিনি রেল শ্রমিকদের মধ্যে সোমেনের সাথে কাজ করেছেন, তরুণ ছাত্রনেতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী মিছিলে তাঁর সক্রিয় সাথী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং ঢাকার আরো অনেক প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠক। সোমেন চন্দ কেবল লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছোটগল্প 'ইঁদুর'। এই গল্পে তিনি মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৯৩৯ সালে তিনি ঢাকার 'প্রগতি লেখক সংঘের' সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং তাঁর লেখনীর মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষকদের না বলা কথাগুলো তুলে ধরেন। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ছিল বাংলার ইতিহাসের এক কলঙ্কিত দিন। এদিন ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার ঋষিকেশ দাস রোডের কদমতলায় একদল উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সশস্ত্র ফ্যাসিবাদীগোষ্ঠী তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য সোমেন চন্দ রেলওয়ে শ্রমিকদের একটি মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলেন। মিছিলটি সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের কাছে পৌঁছালে প্রতিক্রিয়াশীল একদল দুষ্কৃতকারী লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হামলাকারীরা সোমেন চন্দকে ঘিরে ধরে বর্বরোচিতভাবে আঘাত করে। মাত্র ২২ বছরের এই তরুণকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে এবং খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সোমেন চন্দকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও বেঁচে আছে বাংলার প্রগতিশীল সাহিত্যে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, বয়সের চেয়ে কাজের গুরুত্ব অনেক বেশি। আজকের তরুণদের জন্য সোমেন চন্দ কেবল একটি নাম নয়, বরং এক অনুপ্রেরণার নাম—যিনি শিখিয়েছিলেন অন্যায় দেখলে সোচ্চার হতে আর শ্রমিকের হাতে হাত রেখে নতুন পৃথিবী গড়তে। বাংলার মেহনতি মানুষের মুক্তির মিছিলে যে তরুণটি কলম আর প্রাণ—দুটোই বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম সোমেন চন্দ। মাত্র ২২ বছরের এক ক্ষুদ্র জীবন, অথচ তার ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। ঢাকার পগোজ স্কুলের সেই শান্ত ছেলেটি কীভাবে রেলওয়ে শ্রমিকদের প্রিয় 'কমরেড' হয়ে উঠলেন এবং তাঁর 'ইঁদুর' গল্পের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করলেন, সেই রোমাঞ্চকর ও ত্যাগের গল্পই বলার জন্যই এই আয়োজন। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চের সেই রক্তিম দুপুর, সূত্রাপুরের রাজপথ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর নির্ভীক লড়াইয়ের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। "মানুষ মরে যায়, কিন্তু তাঁর প্রতিবাদী চেতনা অমর।"